ঢাকা , শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ , ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশ, সময় ও বিদ্রোহের কাব্য মাটি, মাতৃত্ব ও মৃত্যুভয়হীন প্রজন্মের তিনটি কবিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০২-২৩ ২৩:২৬:০৯
দেশ, সময় ও বিদ্রোহের কাব্য মাটি, মাতৃত্ব ও মৃত্যুভয়হীন প্রজন্মের তিনটি কবিতা দেশ, সময় ও বিদ্রোহের কাব্য মাটি, মাতৃত্ব ও মৃত্যুভয়হীন প্রজন্মের তিনটি কবিতা


স্টাফ রিপোর্টার পঞ্চগড় 

দেশপ্রেম কেবল একটি অনুভূতি নয়, এটি এক গভীর দায়বদ্ধতা। সময় কেবল বারো মাসের হিসাব নয়, এটি অপেক্ষা ও জন্মযন্ত্রণার অনন্ত গণনা। আর বিদ্রোহ মানে ধ্বংস নয়—এটি স্মৃতির ভিতরে বেঁচে থাকা প্রতিরোধ। এই তিনটি কবিতায় উঠে এসেছে মাটি, মা, ইতিহাস, শাসন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

 ১️⃣ দেশ আমার

এই মাটির গভীরে আমার শিকড়, আমার অস্তিত্ব।
দেশ আমার—
তুমি কি জানো, তোমার ধূলিকণায় কত নীরব দীর্ঘশ্বাস আর ভালোবাসা মিশে আছে?
প্রতিটি ধাপে এখানে ইতিহাসের রক্তভেজা ঘ্রাণ পাওয়া যায়,
বাতাসে আজও বাজে হারানো স্বজনদের অস্ফুট হাহাকার।
জন্ম থেকেই তোমাকে চেয়েছি, তোমার নীল আকাশেই প্রথম নিঃশ্বাস নেওয়া।
আমার প্রথম হাসি, প্রথম কান্নার সাক্ষী তোমার এই শ্যামল বুক।
এই মাটিই হোক আমার শেষ শয্যা,
রক্ত দিয়ে হলেও আগলে রাখব তোমায়।
আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন মিশে আছে তোমার নদী, মাঠ আর সবুজ অরণ্যে।
দেশ, তুমি কেঁদো না—
তোমার চোখ মুছিয়ে দিতে আমার এই কলম আর প্রাণ সদা জাগ্রত।
তুমিই আমার শেষ ঠিকানা,
তুমিই আমার বেঁচে থাকার চূড়ান্ত প্রার্থনা।

 ২️⃣ সময় কি কেবল বারো মাস?

রাতের উঠোনে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে,
সে নিজেকেই শুধাল—
“সময় কি কেবল দেয়াল ঘড়ির কাঁটা, নাকি বুকের গভীর ক্ষত?”
মা একবার বলেছিল,
“খোকা, বছর তো বারো মাসে হয় না রে,
কিছু বছর জন্ম নেয় নয় মাসের অসহ্য নীরব যন্ত্রণায়।”
সেই নয় মাস, যখন চোখজুড়ে ঘুম থাকে না,
কেবল থাকে এক নামহীন প্রতীক্ষা।
প্রতিটি ভোর যেন এক একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস,
যা বলে যায়— “আজও একটি দিন ফুরালো।”
চুলে হয়তো পাক ধরেনি,
কিন্তু মনের ওপর জমেছিল এক প্রজন্মের ক্লান্তি।
লোকে বারো মাসের হিসেবে বছর গোনে,
আর আমি নয় মাসের একেকটি মুহূর্তে জীবনকে চিনেছি।
যেদিন সেই নীরবতা ভেঙে
প্রথম কান্নার শব্দ আকাশ কাঁপালো,
সেদিন বুঝলাম—
সময় সংখ্যায় নয়, বরং শ্বাসের ভেতরে নতুন এক শ্বাসের জন্মে।
আকাশের বারো মাস আকাশের থাক,
আমার ওই নয় মাসই এক পূর্ণ জীবন।

 ৩️⃣ মৃত্যু যাদের ভয় দেখায় না

আমার জন্ম হয়েছিল ভোরের আলো ফোটার আগে,
যখন চারদিকে শিকল ভাঙার শব্দ
আর লাল কালিতে স্বপ্ন কাটাকুটির খেলা।
মা শিখিয়েছিলেন—
“বাঁচলে বুক ফুলিয়ে বাঁচিস,
আর মরলে মাথা উঁচু করে মরিস।”
আমি দেখেছি শাসনের নামে দন্তবিকাশ,
বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে নদী চুরি,
আর সীমান্তের ওই কাঁটাতারের নির্মম অহংকার।
ওরা দম্ভভরে নিজেদের শক্তিশালী বলে,
আমি প্রশ্ন করি—
শক্তি কি তবে কেবল দুর্বলের কণ্ঠরোধে?
আমার মহাকাব্যে কোনো রাজা নেই,
আছে মেহনতি মানুষের ফাটা হাত,
নদীর আর্তনাদ আর বজ্রধারী একদল যুবক।
ভয় পাইনি কোনোদিন—
নত হইনি কোনো মসনদে কিংবা কোনো রাঙা চোখে।
মৃত্যু যখন দুয়ারে আসবে, বলব—
“আমি তৈরি।”
আমি জন্মেছি প্রশ্ন করতে,
আর প্রশ্ন তুলেই বিদায় নিতে চাই।
আমার বিদ্রোহ কোনো মারণাস্ত্র নয়, এটি একটি স্মৃতি—
যা রক্তের দামে কেনা ইতিহাসকে মরতে দেবে না।
এই যন্ত্রণার গল্পই একদিন কবিতা হয়ে রাজপথে হাঁটবে,
সেদিন কেউ চোখ নামাবে না, কেউ গলা নামাবে না।
সবাই জানবে—
যাদের মাঝে মৃত্যুভয় নেই, তাদের পরাজিত করার সাধ্য কারো নেই।

 সম্পাদকীয় নোট

এই তিনটি কবিতা আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি। এখানে দেশপ্রেম কোনো স্লোগান নয়, সময় কোনো ক্যালেন্ডার নয়, আর বিদ্রোহ কোনো অস্ত্র নয়—এগুলো আমাদের অস্তিত্বের গভীরে গাঁথা বাস্তবতা।

লেখক পরিচিতি

রাজু তুহিন একজন তরুণ লেখক, সাংবাদিক ও স্ক্রিপ্ট রাইটার। উত্তরাঞ্চলের মাটি ও মানুষের জীবন, দেশপ্রেম, সামাজিক বৈষম্য, ইতিহাসচেতনা এবং মানবিক সংকট তার লেখার প্রধান অনুষঙ্গ। কবিতা, নাটক ও প্রবন্ধে তিনি সময়, মাতৃত্ব, সংগ্রাম ও বিদ্রোহের ভাষা খুঁজে ফেরেন।
তার লেখায় ব্যক্তিগত অনুভবের সঙ্গে মিশে থাকে সমষ্টির আর্তনাদ, প্রশ্ন এবং প্রতিরোধের শক্তি। শব্দকে তিনি কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ব্যবহার করতে বিশ্বাসী।
গ্রাম: টোকাপাড়া
পোস্ট অফিস: ভিতরগড়
ইউনিয়ন: হাবিজাবাদ
থানা ও জেলা: পঞ্চগড়, বাংলাদেশ
বর্তমানে তিনি লেখালেখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও নাট্যচর্চার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ